স্বাস্থ্য সচেতনদের পছন্দের পানীয় হিসেবে বরাবরই জনপ্রিয় লেবুজল (Lemon water)। দিনের শুরু থেকে শুরু করে খাওয়ার আগে-পরে, এক গ্লাস লেবুজল খাওয়া অনেকেরই রোজকার রুটিনের অংশ। যেকোনো সময় লেবুজল খেলেই যে সমান উপকারিতা মেলে, ব্যাপারটা এমন নয়। বরং সময়ভেদে বদলে যায় লেবু জলের উপকারিতা আবার উপকারিতার ওপর ভিত্তি করে আপনিও বদলে নিতে পারেন লেবুজল, খাওয়ার সময়। একনজরে দেখে নিন কখন লেবুজল খেলে কেমন উপকার পেতে পারে আপনার শরীর।

খাওয়ার আগে লেবুজল খেলে যা হয়:-
খাওয়ার ঠিক আগে এক গ্লাস লেবুজল খেলে তা ক্ষুধা বাগে আনে। লেবুজলে অম্লতা বেশি, যা খাবার হজমের জন্য পেটকে প্রস্তুত করে। এতে খাবারের পুষ্টিগুণ সহজে শোষিত হয়। এছাড়া খাওয়ার আগে এক গ্লাস লেবুজল খেলে তা ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে। এতে খাওয়ার সময় অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের হার কমায়।
খাওয়ার পরে লেবুজল খেলে যা হয়:-
লেবুতে আছে প্রচুর সাইট্রিক অ্যাসিড, যা পাকস্থলীতে গিয়ে হজমে সাহায্য করে। ভারী খাবার খাওয়ার পর লেবুজল খেলে হজমের কাজটা সহজ হয়। ভারী খাবার খাওয়ার পর যে অস্বস্তি তৈরি হয়, তা-ও অনেকাংশে কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে লেবুজল। বদহজম বা অম্বলের সমস্যাতেও উপকারী হতে পারে লেবুজল। এ ছাড়া খাওয়ার পর পাকস্থলীর পিএইচ মান নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। শরীরের জলশূন্যতা দূর করতে লেবুজলের তুলনা কমই আছে। শরীরে বেশিরভাগ সমস্যার সূচনা হয় জলশূন্যতা থেকে। কুসুম গরম লেবু-জল শরীরের জলশূন্যতা পূরণে সাহায্য করে।
জেনে রাখা ভালো:-
লেবুজল খাওয়ার সঠিক কোনো নিয়মকানুন নেই। চাহিদামতো যেকোনো সময় খেতে পারেন। তাই আপনার জীবনযাপন এবং শরীরের অবস্থার বুঝে লেবুজল খাওয়ার সময় ঠিক করে নিন। তবে আর যা-ই করুন, একদম খালি পেটে লেবুজল খাবেন না। খালি পেটে লেবুজলের অম্লতা ভালোর বদলে খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া এটি দাঁতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই লেবুজল খাওয়ার পর কুলকুচি করে নেওয়া ভালো। এতে দাঁতের এনামেলের ক্ষতি হবে না। উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে নিয়মিত লেবুজল খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
তবে লেবুজল খাওয়ার সঠিক নিয়ম নেই, তবে উপকারিতার ওপর ভিত্তি করে খাওয়ার সময় নির্বাচন করা যেতে পারে।
- খাওয়ার আগে: ক্ষুধা কমাতে ও হজম প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করতে সহায়তা করে।
- খাওয়ার পরে: হজমে সাহায্য করে এবং ভারী খাবার পরবর্তী অস্বস্তি দূর করে।
- যেকোনো সময়: শরীরের জলশূন্যতা পূরণে সহায়তা করে, তবে খালি পেটে লেবুজল খাওয়া উচিত নয়, কারণ এটি অম্লতার কারণে ক্ষতি করতে পারে।
- দাঁতের সুরক্ষার জন্য খাওয়ার পর কুলকুচি করা উচিত।
ক্ষতিকারক দিকগুলি হল:-
লেবুজলের কিছু ক্ষতিকারক দিকও রয়েছে, বিশেষ করে যদি সঠিক নিয়মে না খাওয়া হয়:
- অম্লতার সমস্যা: লেবুজলে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড খালি পেটে খেলে অম্লতা ও বুকজ্বালা হতে পারে।
- দাঁতের ক্ষতি: লেবুজলের অ্যাসিড দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে, ফলে দাঁত দুর্বল হতে পারে।
- পেটের সমস্যা: অতিরিক্ত লেবুজল খেলে বদহজম বা পেট ফাঁপার সমস্যা হতে পারে।
- অতিরিক্ত মূত্রত্যাগ: লেবুজলে ভিটামিন C-এর মাত্রা বেশি, যা অতিরিক্ত মূত্রত্যাগের কারণ হতে পারে।
আরো পড়ুনঃ- কাঠবাদাম (Peanut): ওজন কমানো থেকে মস্তিষ্কের বিকাশ
শক্তিশালী অমৃত উন্মোচন: চা-এর উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য উপকারিত
FAQ:
লেবুজল কতবার খাব?
লেবুজল পরিমিত মাত্রায় খাওয়া উপকারী, তবে অতিরিক্ত খাওয়া কিছু সমস্যার কারণ হতে পারে। সাধারণত, দিনে ১-২ গ্লাস লেবুজল খাওয়া ভালো। তবে খাওয়ার সময় ও শরীরের অবস্থা অনুযায়ী এটি পরিবর্তিত হতে পারে:
- সকালে: খালি পেটে না খেয়ে হালকা নাশতার পর কুসুম গরম লেবুজল খেতে পারেন।
- খাওয়ার আগে: খাওয়ার আগে এক গ্লাস লেবুজল ক্ষুধা কমায় ও হজমে সহায়তা করে।
- খাওয়ার পরে: ভারী খাবার খাওয়ার পর হজমের জন্য লেবুজল উপকারী।
তবে দৈনিক লেবুজল খাওয়ার আগে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লেবুজল রাতে খাব?
রাতে লেবুজল খাওয়া যেতে পারে, তবে এটি কিছু বিষয়ে নির্ভর করে। ভারী খাবার খাওয়ার পর এক গ্লাস লেবুজল হজমে সাহায্য করতে পারে এবং পেটের অস্বস্তি কমাতে সহায়ক হয়। তবে, যদি আপনার অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকে, তাহলে রাতে লেবুজল খাওয়া থেকে বিরত থাকা ভালো, কারণ এতে অম্লতা বা অ্যাসিডিটি বেড়ে যেতে পারে।
লেবুজলের অম্লতার কারণে দাঁতের ক্ষতি এড়াতে খাওয়ার পর কুলকুচি করে নেওয়া উচিত।
লেবুজল কেমন করে খাব?
লেবুজল সঠিকভাবে খেতে কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত:
- খালি পেটে খাবেন না: খালি পেটে লেবুজলের অম্লতা পেটের ক্ষতি করতে পারে, তাই খাওয়ার আগে বা পরে খান।
- কুসুম গরম পানিতে : কুসুম গরম পানির সঙ্গে লেবু মিশিয়ে খেলে হজমে সাহায্য করে এবং শরীরকে ডিটক্সিফাই করে।
- কথা বলার পর কুলকুচি: দাঁতের এনামেল রক্ষার জন্য লেবুজল খাওয়ার পর কুলকুচি করে নিন।
- পরিমিত মাত্রায়: দিনে ১-২ বার লেবুজল পান করতে পারেন, অতিরিক্ত খাবেন না।
লেবুজল কি ওজন কমায়?
হ্যাঁ, লেবুজল ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে। এতে ক্যালোরি কম থাকে এবং এটি বিপাকক্রিয়া (metabolism) বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়াও, লেবুজলে থাকা ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের ফ্যাট বার্নিং প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। খাবার আগে লেবুজল খেলে ক্ষুধা কমে, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে লেবুজল নিজেই ওজন কমায় না; এর সঙ্গে সুষম খাদ্য এবং ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ন।
ওজন কমাতে কতদিন খাব?
ওজন কমাতে লেবুজল দীর্ঘমেয়াদে প্রতিদিন পান করা যেতে পারে। তবে, এটি একমাত্র উপায় নয়। লেবুজল ওজন কমানোর একটি সহায়ক উপাদান, তাই এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর ডায়েট এবং নিয়মিত ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত সকালে খালি পেটে না খেয়ে নাশতার আগে বা খাবারের আগে লেবুজল পান করতে পারেন। এতে হজম প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় এ কিবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে লেবুজলের অতিরিক্ত অম্লতা থাকায়, প্রতিদিনের গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিমিতি বজায় রাখা উচিত।